ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪, ৭ আষাঢ় ১৪৩১, ১৪ জিলহজ ১৪৪৫

জমজম: চির বহমান পবিত্র ঝর্ণাধারা

প্রকাশনার সময়: ১১ জুন ২০২৪, ০৮:৩৫

জমজম। কী মধুর নাম! কী সুন্দর উচ্চারণ! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম পানি। এ পানি শুধু পিপাসাকাতর কলিজাকেই শীতল করে না, হূদয় ও আত্মাকেও এক অপার্থিব প্রাপ্তিতে পরিতৃপ্ত করে। দেহ ও মনকে সজীব করে তোলে। মক্কা নগরীতে আল্লাহর এক মহানিদর্শন হলো জমজম কূপ। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভূমিতে আল্লাহ তায়ালা এ কূপ উৎসারিত করেছেন।

পরবর্তীতে জমজমকে কেন্দ্র করেই আবাদ হয়েছিল পবিত্র মক্কা নগরী। পানি না থাকায় ইতোপূর্বে এখানে কোনো মানুষ বসবাস করত না। এ কূপ উৎসারিত হওয়ার পর ইয়ামানের জুরহুম গোত্র খবর পেয়ে এখানে আসে এবং হাজেরা (রা.)-এর অনুমতি নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ইসমাঈল (আ.) বড় হয়ে এ গোত্রেই বিয়ে করেন এবং ধীরে ধীরে পবিত্র মক্কা নগরী গড়ে ওঠে। তাই বলা যায়, জমজম কূপই ছিল বর্তমান মক্কা আবাদ হওয়ার প্রধান অবলম্বন।

জমজম চিরবহমান। আজ পর্যন্ত এর পানি কখনো শুকায়নি। হাজার হাজার বছর ধরে কোটি কোটি হাজীর তৃষ্ণার্ত হূদয়ের পিপাসা মিটিয়ে আসছে। তারা নিজেরা পান করছেন এবং বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন পৃথিবীর দূর-দূরান্তের জনপদে। ফলে মক্কায় না গিয়েও সারা বিশ্বের মুসলিম এ পানির বরকত ও কল্যাণ লাভে ধন্য হচ্ছে।

এ পানির যে গুণ-বৈশিষ্ট্য এবং বরকত ও কল্যাণ হাজার বছর আগে ছিল ঠিক সেই গুণ-বৈশিষ্ট্য ও বরকত আজ হাজার বছর পরও বিদ্যমান। যুগ যুগ ধরে আল্লাহর কুদরতের মহা নিদর্শনরূপে স্থায়ী হয়ে আছে জমজম কূপ।

জমজম: পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পানি

ইবনে আব্বাস (রা.) নবীজি (সা.) থেকে বর্ণনা করেন- ‘জমজম ভূপৃষ্ঠের শ্রেষ্ঠ পানি। এতে রয়েছে খাদ্যের বৈশিষ্ট্য ও রোগ থেকে মুক্তি।’ (তাবারানী: ১১১৬৭)

জমজম ধারণ করে আছে ত্যাগ ও বিসর্জনের এক ইতিহাস

জমজম ধারণ করে আছে ত্যাগ ও বিসর্জনের এক ইতিহাস। এ পানি যেন পানি নয়; বরং হাজেরা-ইবরাহীম-ইসমাঈলের (আ.) ত্যাগের বিনিময়ে আল্লাহর রহমতের ঝর্ণাধারা।

আল্লাহ তায়ালার হুকুমে ইবরাহীম (আ.) স্বীয় পুত্র ইসমাঈল (আ.) ও স্ত্রী হাজেরা (রা.)কে জনমানবহীন মক্কায় রেখে রওনা হলেন। ইবরাহীম (আ.) যখন সেখান থেকে চলে আসতে লাগলেন, তখন হাজেরা (রা.) তাকে বারবার বলতে লাগলেন- এমন জনমানবহীন মরু প্রান্তরে আমাদের একাকী রেখে আপনি চলে যাচ্ছেন?! কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দিচ্ছিলেন না। অবশেষে হাজেরা (রা.) বললেন- ‘আল্লাহই কী আপনাকে আমাদের এখানে রেখে যেতে বলেছেন? তিনি উত্তরে বললেন- হ্যাঁ। হাজেরা (রা.) তখন (ঈমানদীপ্ত কণ্ঠে বললেন,) তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না।’

‘তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না।’ এ উত্তরের মাধ্যমে হাজেরা (রা.) যেন বলতে চাইলেন, এ যখন আল্লাহর হুকুম তখন তা শিরোধার্য। যে কোনো ত্যাগ বিসর্জনের বিনিময়ে তা আমি শিরোধার্য করছি। আর আল্লাহর হুকুমের সামনে যে নতশির হয় তাকে কি আল্লাহ ভুলে যাবেন? আপনার উপস্থিতি ছাড়াই তিনি আমাদের ভালো রাখবেন, তিনিই হবেন আমাদের সহায়।

ইবরাহীম (আ.) চলে গেলেন। তার কি মন চাচ্ছিল- এ নির্জন মরুভূমিতে স্ত্রী-পুত্র রেখে যেতে? না, তিনিও উৎকণ্ঠিত হচ্ছিলেন। অজানা উৎকণ্ঠা তাকে বিচলিত করে ফিরছিল। তাই তো যখন তিনি তাদের দৃষ্টিসীমার আড়াল হলেন কাবা অভিমুখী হয়ে দোয়া করলেন, স্ত্রী-পূত্রকে আল্লাহর হাওয়ালা করলেন; তিনি বললেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরের কতককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় তোমার গৃহের নিকটে!...’ (সুরা ইবরাহীম (১৪): ৩৭)

চারিদিকে ধূ ধূ মরুভূমি। নির্জন প্রান্তর। কোনো লোকজন নেই। দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত শুধু বালুর ঢেউ। কেমন ভয় ও একাকীত্ব, উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতা তখন ছিল হাজেরা (রা.)-এর মনে তা কল্পনা করাও সম্ভব নয়। তবুও তিনি সন্তুষ্ট মনে বরণ করে নিয়েছেন সব কিছু। সমর্পিত হয়েছেন আল্লাহর হুকুমের সামনে।

রেখে যাওয়া সামান্য খাদ্য ও পানীয় শেষ হয়ে গেলে দুগ্ধপোষ্য শিশু ইসমাঈল (আ.) তৃষ্ণায় ছটফট করছিলেন। এমতাবস্থায় হাজেরা (রা.) পানির সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে দৌড়াতে থাকেন। একবার সাফায় যান আবার মারওয়ায়। নাহ! পানির কোনো চিহ্ন নেই, কোনো মানুষও দেখা যাচ্ছে না। আবার সাফায় যান। এভাবে সাফা-মারওয়া পাহাড়দ্বয়ে সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেন। এরপরও পানি না পেয়ে অস্থির হয়ে পড়েন। পানির কোনো সন্ধান নেই। কোনো উপায় নেই। এখন আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আল্লাহর রহমতই এখন একমাত্র ভরসা। ঠিক তখনই জমজম রূপে নেমে আসে আল্লাহর রহমত। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ফেরেশতার পাখার আঘাতে সৃষ্টি হয় এক অলৌকিক কূপ। বের হয়ে আসতে লাগল পানির ফোয়ারা!

হাজেরা (রা.) তখন পানির স্রোতধারা আটকানোর জন্য চারিদিকে বাঁধ তৈরী করতে লাগলেন। রাসুল (সা.) বলেন- ‘আল্লাহ তায়ালা উম্মে ইসমাঈলের ওপর রহম করুন। তিনি যদি জমজমকে এভাবে ছেড়ে রাখতেন তাহলে তা প্রবহমান ঝর্ণায় পরিণত হতো।’ (বুখারি: ৩৩৬৪)

জমজম আমাদেরকে ত্যাগ ও বিসর্জনের শিক্ষা দেয়। আল্লাহর হুকুম পালনার্থে পৃথিবীর সব সুখ ও আনন্দ এবং নিজের ইচ্ছা ও চাহিদাকে কোরবান করে আল্লাহর জন্য পুরোপুরি সমর্পিত হওয়ার চেতনায় উজ্জীবিত করে তোলে।

আল্লাহর রহমতের প্রত্যক্ষ সাক্ষী এ জমজম

হাজেরা (রা.) যখন শিশু ইসমাঈল (আ.)-এর জন্য উৎকণ্ঠিত, একটুখানি পানির আশায় এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছেন, পৃথিবী যখন অন্ধকার হয়ে আসছিল চোখের সামনে, আশার কোনো আলো দেখা যাচ্ছিল না, সমাধানের কোনো উপায় বুঝে আসছিল না, তখনই নেমে আসে রহমতের বারিধারা। আবে জমজম।

বান্দা যদি আল্লাহর ফয়সালা মেনে নেয়, আল্লাহমুখী হয়, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে তাহলে আল্লাহর রহমত তার শামিলে হাল হয়- এ জমজম তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। জমজম আমাদেরকে আল্লাহর রহমতের আশাবাদী হতে উদ্বুদ্ধ করে। বিপদের ঝঞ্ঝাবায়ুর মাঝেও মুক্তি লাভের আশায় বুক বেঁধে রাখার প্রেরণা জোগায়। আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী করে।

জমজমে রয়েছে নববী বরকতের স্পর্শ

যুগ যুগ ধরে জমজম নিজের মাঝে ধারণ করে আছে নববী বরকতের এক স্পর্শ। নবীজির মুখের পানি মিশে আছে এ পবিত্র কূপে। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, একবার নবীজি জমজম কূপের কাছে আসেন। আমরা তখন সেখান থেকে এক পেয়ালা পানি তাকে দিই। তিনি পানি পান করে কিছু পানি পেয়ালায় কুলি করেন। আমরা তখন পেয়ালার সে পানি জমজম কূপে ঢেলে দেই। (মুসনাদে আহমাদ: ৩৫২৭)

এ হাদীসের প্রেক্ষাপটে যফর আহমদ উসমানী (রহ.) বলেন, ‘জমজম কূপে নবীজির মুখের পানি মেশার দরুণ এ পানির স্বাদ ও বরকত এবং নূর ও পবিত্রতা আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। নবীজি তাঁর উম্মতের প্রতি কতটা দয়ালু যে কিয়ামত পর্যন্ত আগত উম্মতকে তিনি তার বরকত থেকে বঞ্চিত করতে চাননি।’

বরকতের সেই স্পর্শে আমাদেরও ধন্য কর হে আল্লাহ! আজ হাজার বছর পরও নবীপ্রেমিক বান্দা জমজম পানের সময় সে বরকত প্রত্যাশা করে।

জমজমের পানি পান করার আদব

জমজমের পানি পান করার কয়েকটি আদব রয়েছে। এ পানি পান করার সময় সে আদবগুলোর প্রতি সবার যত্নশীল হওয়া উচিৎ।

১. কিবলামুখী হয়ে পান করা।

২. তিন শ্বাসে পান করা।

৩. প্রত্যেকবার বিসমিল্লাহ পড়া।

৪. প্রতি শ্বাসের পর আলহামদুলিল্লাহ বলা।

৫. ডান হাতে পান করা।

৬. পান করার সময় দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ লাভের দোয়া করা।

৭. পেট ভরে পরিতৃপ্ত হয়ে বেশী বেশী পান করা। (ফাদলু মায়ী যামযাম পৃ. ১৯২-১৯৪)

শেষ আদবটির প্রতি হজ ও ওমরাকারীদের বিশেষ খেয়াল রাখা দরকার। মনে রাখতে হবে, জমজমের পানি পেট ভরে পান করা কাম্য।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের জমজমের পানির যাবতীয় কল্যাণ দান করুন।

নয়াশতাব্দী/জিএস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ