ঢাকা, সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১, ৮ মহররম ১৪৪৬

ঐতিহাসিক হিজরতের স্মারক হিজরী পঞ্জিকা

প্রকাশনার সময়: ০৯ জুলাই ২০২৪, ২৩:১৪

হিজরী সন ইসলামের নিদর্শনাবলীর অন্যতম। আমরা যখনই হিজরী সালের মাধ্যমে তারিখ নির্ণয় করি, নিজেদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী এবং ইসলাম ধর্মের অন্যতম অনুসারী হিসেবে বিবেচনা করি। চীনা তারিখ, পারস্য তারিখ, জাপানি তারিখ অথবা ভারতীয় তারিখ নিজস্ব দিনপঞ্জি নির্ণয়ে এসব সাম্রাজ্যের সম্পর্ক খ্রিস্টীয় সালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আর এদের সঙ্গে আমাদের হিজরী সনের কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে যেসব জাতির ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য রয়েছে এবং আসমানী কিতাবপ্রাপ্ত হয়েছে, তাদের তারিখের সঙ্গেও হিজরী সনের কোনো সম্পর্ক নেই। সুতরাং হিজরী সন বাদ দিয়ে শুধু খ্রিস্টীয় সাল গ্রহণ করা আমাদের জন্য অনুচিত।

ইসলামের আগে প্রাচীনকালে আরবের মানুষ কোনো ধরনের তারিখ ব্যবহার করত না। মক্কা ও এর আশপাশসহ পুুরো আরবে নিজস্ব কোনো তারিখ গণনার পদ্ধতি প্রচলন ছিল না এবং আরবরা ভারত, ইরান বা অন্য কোনো অঞ্চলের ক্যালেন্ডারও ব্যবহার করত না। আরবরা মূলত বড় ও বিশেষ কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনক্ষণের হিসাব রাখত। তারিখ উল্লেখ করতে বলত, ‘আমি হস্তি বাহিনীর ঘটনা বা কাবা বিধ্বস্তের দুই বছর পর জন্মগ্রহণ করেছি।’

অনুরূপ নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা উল্লেখ করে তার আগপাছ দু-এক বছর উল্লেখ করে তারিখ নির্ধারণ করত। তারপর ইসলামের আগমন ঘটল। আমাদের নবী (সা.) প্রেরিত হলেন। তখনো তারিখ নির্ধারণের সেই প্রাচীন পদ্ধতি অব্যাহত ছিল। তখনো বলত, ‘ওমুক বদর যুদ্ধের দুই বছর আগে জন্মেছে। ওমুক খন্দক যুদ্ধের দুই বছর পরে জন্মেছে।’

মোটকথা, নবুয়্যতের এ সময়েও উল্লেখযোগ্য ও প্রসিদ্ধ কোনো ঘটনা বা যুদ্ধ-বিগ্রহকে কেন্দ্র করেই তারিখ গণনা করা হতো। ওমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে সাহাবী আবু মুসা আশয়ারি (রা.) খলিফা ওমর (রা.) এর কাছে চিঠি পাঠালেন। চিঠিতে লেখা ছিল, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! তারিখের স্থানে শাবান বা মহররম লিখিত আপনি আমাদের কাছে অনেক দাপ্তরিক চিঠি প্রেরণ করেন। কিন্তু কোন বছরের শাবান ও মহররম, গত বছরের নাকি সামনের বছরের? আমরা নির্ণয় করতে পারি না। কারণ চিঠি উট বা অন্য কোনো জন্তুযোগে আমাদের হাতে আসে, যা বেশ সময়সাপেক্ষ বিষয়। আবার এ চিঠি হেফাজতে গাফিলতির কারণে কোনো বছরের শাবান ও মহররম তা জানা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সুতরাং এ সমস্যা সমাধানে আপনি আমাদের জন্য একটি ক্যালেন্ডার নির্মাণ করুন।’

তখন ওমর (রা.) মুসলমানদের জন্য একটি বর্ষপঞ্জি আবিষ্কার করলেন। ইসলামী দিনপঞ্জিকার প্রয়োজনের এ ঘটনা ১৬ বা ১৭ হিজরীতে ঘটেছে। ওমর (রা.) দীর্ঘ ৫-৬ বছর ইসলামী দিনপঞ্জি প্রণয়নে অভিজ্ঞ ও বিজ্ঞ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং মতবিনিময় করেন। এ সময় কারো মত ছিল, হিজরী সালের গণনা নবুয়্যতের বছর থেকে শুরু করা হোক। আবার কেউ বললেন, নবীজির জন্মের বছর থেকে। পরিশেষে নবীজির মদিনায় হিজরতের বছর থেকে হিজরী বর্ষের গণনা শুরু করা হয়। নবীজির জন্ম পুরো বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ। কিন্তু জন্মের দিন ও বছর সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণে মতানৈক্য থাকায় হিজরী বছরের সূচনা নির্ধারণে হিজরতের বছরকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। কেননা হিজরতের সঠিক সময় সম্পর্কে কারো কোনো দ্বিমত ছিল না। তাছাড়া হিজরতের মধ্য দিয়েই ইসলামী বিজয়ের ইতিহাসের সূচনা হয়। রাসুল (সা.)-এর বরকতময় এ হিজরতেই ইসলামী রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী গঠন ও কাফেরদের বিতাড়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। হিজরতের মাধ্যমে রাসুল (সা.) নবুয়্যতের স্থায়ী আবাস লাভ করেন। আর এখানেই সারা দুনিয়া থেকে মানুষ ইসলাম গ্রহণের জন্য ছুটে আসতেন এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র প্রতিনিধি সমবেত হতেন।

হিজরী তারিখের মাধ্যমে মুসলমানরা ইবাদত-বন্দেগী ও দ্বীনি কার্যাবলীর দিনক্ষণ নির্ধারণ করে থাকেন। এখন যদি হিজরী তারিখ বাদ দেয়া হয় তাহলে তারা আইয়ামে বিজ তথা প্রতি আরবী মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের সুন্নত রোজা কী দেখে রাখবেন? মহররমের ১০ তারিখ আশুরার রোজা কী দেখে রাখবেন? জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখে রোজা রাখলে তো আর আশুরার রোজা হবে না!

হিজরী তারিখের ব্যাপারে আমরা যদি উদাসীনতা প্রকাশ করি; অবহেলা করে চিঠিপত্র, দরখাস্ত, ই-মেইল বা দৈনন্দিন বিভিন্ন ডকুমেন্টারিতে এ তারিখ ব্যবহার না করি তাহলে মুসা (আ.) ফেরাউন থেকে নাজাতের আশুরার সেই ঐতিহাসিক দিনটি কীভাবে স্মরণে থাকবে? রমজান, ঈদ-উল ফিতরের আগমন ও প্রস্থান কীভাবে নির্ণয় করা হবে? বিধবা নারীরা ইদ্দতের ৪ মাস ১০ দিন কী দেখে গণনা করবে? ইংরেজি ক্যালেন্ডার দেখে এগুলো নির্ণয় কি সম্ভব! হিজরী তারিখ বাদ দিলে সামনে এমন এক প্রজন্মের উত্থান হবে, যারা তারিখে ইবনে কাছির খুলবে যেখানে হিজরী তারিখ অনুযায়ী ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। বইয়ের পৃষ্ঠায় এ তারিখরীতি দেখে তাদের এমন অবস্থা হবে, যেন চায়নিজ বা ভারতীয় দুর্লভ কোনো ইতিহাসের বই পড়ছে। এর পরের প্রজন্ম তো চিনতেই পারবে না, এতে ইসলামী ইতিহাস লেখা নাকি অন্য কিছু!

আগত প্রজন্মের এ ইতিহাস বিস্মৃতি সেই জাতির জন্য বড় কলঙ্কের বিষয়, যারা নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী বর্ষপঞ্জি সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ। আর এ কারণেই হয়তো হিজরী ছেড়ে ঈসায়ি ক্যালেন্ডার গ্রহণ করতে হবে। উদারতা প্রকাশের প্রয়োজনে হিজরী সালের পাশে খ্রিস্টীয় সাল লেখা যায়। তবে রাসুল (সা.)-এর হিজরতকে স্মরণ করতে সব সময় নিজেদের আদর্শিক হিজরী তারিখ ব্যবহারে সবাইকে তাগিদ দিতে হবে। হিজরী সনকে বর্জন করে একে অবহেলায় নিক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই।

বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, তারিখ গণনায় অনেক দেশেরই স্বতন্ত্র ক্যালেন্ডার আছে। চীনের অধিবাসীদের কাছে তাদের সাংস্কৃতিক দিনপঞ্জি আছে এবং তারা সেটা ব্যবহার করতে গর্ববোধও করে। তবে সেই ক্যালেন্ডারের সঙ্গে ইংরেজি সালও জুড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু আজ চীনা কত তারিখ? জিজ্ঞেস করলে তারা কোনো ইতস্ততা ছাড়াই সঠিক তারিখ বলতে পারে। অনুরূপ নিজস্ব সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডার ইরানিদের কাছেও আছে। ভারতীয়দের কাছেও আছে এবং তারা সেগুলো ব্যবহারও করে। মানসিকভাবে পরাভূত ও অমুসলিমদের অনুসারী কিছু মানুষ যুক্তি দেখায়, আমাদের হিজরী তারিখ ব্যবহারে কী লাভ? দুনিয়ার কাজকর্মে তো একমাত্র ইংরেজি তারিখই ব্যবহার করতে হয়। আপনি তাকে বলুন, ‘বেশ তো! চীনারা যখন চীনা ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে। আপনি গলা চেঁচিয়ে বলেন, তারা নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণে ব্যবহার করে। অথচ হিজরী সাল শুধু আপনার সংস্কৃতি নয় বরং দ্বীনের একটি প্রতীক। আপনি অন্যের অনুসরণ করে নিজের সংস্কৃতির নিদর্শন নষ্ট করছেন। মুসলমান হিজরী সনকে ত্যাগ করে শুধু খ্রিস্টীয় সাল ব্যবহার করলে বিজাতীয়দের অনুসরণ বলে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিজাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ)

বিশ্বখ্যাত সৌদি ইসলাম প্রচারকের জুমার খুতবা থেকে ভাষান্তর মুহাম্মদ ইশরাক।

নয়া শতাব্দী/এসআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ