ঢাকা, সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১, ৮ মহররম ১৪৪৬

সালাম ইসলামী রীতির উৎকৃষ্ট সম্ভাষণ

প্রকাশনার সময়: ২১ জুন ২০২৪, ০৯:০০

সালাম ইসলামী সংস্কৃতিতে বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলোর মধ্যে অন্যতম। ইসলামে প্রত্যেক মুসলিমের মধ্যে সালাম আদান প্রদানের ব্যাপক প্রচলনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও বিভিন্ন হাদীসে এ বিষয়ে অনেক নির্দেশনা পাওয়া যায়। আজকে আমরা জানব ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ সালামের আভিধানিক অর্থ, হুকুম, সালামের মাসনুন শব্দসমূহ, সালামের জবাবের মাসনুন শব্দসমূহ ও সালাম ব্যতীত অন্য সংস্কৃতির সম্ভাষণগুলো ব্যবহারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও সালাম আদান প্রদানের গুরুত্ব সম্পর্কে। ‘সালাম’ শব্দটি আরবী। বাংলায় এর আভিধানিক অর্থ দাঁড়ায় ‘শান্তি কামনা করা’, ‘নিরাপত্তা কামনা করা’ প্রভৃতি।

ইসলামী ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সৃষ্টিতে সালামের ভূমিকা: ইসলামী ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সৃষ্টিতে সালামের ভূমিকা অপরিসীম। সালাম আদান প্রদানের মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন মজবুত ও সুদৃঢ় হয়ে থাকে। এমনকি কোনো মুসলিম অপর মুসলিমের সঙ্গে সালাম আদান প্রদানের মাধ্যমে শত্রুতা ভুলে গিয়ে একাত্ম হয়ে থাকতে পারে। এ ছাড়া অনুমতি চাওয়ার সময় শুরুতে সালাম প্রদান করে অনুমতি চাওয়ার নির্দেশ কোরআন মাজীদে এসেছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাদের ঘরের বাইরে অন্য কোনো ঘরে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি চাও এবং এর অধিবাসীদের সালাম দাও। তা তোমাদের জন্য উত্তম এইজন্য যে, সম্ভবত তোমরা স্মরণ করবে।” (সুরা নূর: ২৭)

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর যখন তোমরা সম্ভাষিত হও কোনো সম্ভাষণ শব্দ দ্বারা, তখন তোমরা সম্ভাষণ জানাও তার থেকে উত্তম সম্ভাষণের শব্দ দ্বারা অথবা তাই ফিরিয়ে দাও।” (সুরা নিসা: ৮৬)

নবী করীম (সা.) বলেছেন, “একজন মুসলিমের অপর মুসলিমের ওপর ছয়টি কর্তব্য রয়েছে। যখন সে অসুস্থ হবে তখন তার সেবা করবে, আর যখন মারা যাবে তখন তার নিকট উপস্থিত হবে, সে জবাব দেবে যখন সে ডাকবে, সে তাকে সালাম দেবে যখন সে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, এবং সে যখন হাঁচি দেবে তখন তার উত্তর দেবে এবং অনুপস্থিত ও উপস্থিত সর্বাবস্থায় তার জন্য কল্যাণ কামনা করবে।” (বুখারি, মুসলিম)

নবী করীম (সা.) বলেছেন, “একজন মুসলিমের অপর মুসলিমের ওপর ছয়টি কর্তব্য রয়েছে: যখন সে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে তখন তাকে সালাম দেবে, এবং যখন সে তাকে ডাকবে তখন তাকে জবাব দেবে, এবং যখন সে হাঁচি দেবে তখন তার জবাব দেবে, এবং যখন সে অসুস্থ হবে তখন তার সেবা করবে, এবং যখন মারা যাবে তখন তার জানাজায় উপস্থিত হবে, এবং তার জন্য তাই পছন্দ করবে যা সে পছন্দ করে।” (বায়হাকি)

নবী করীম (সা.) আরো বলেন, “ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ না তোমরা ঈমান আনবে। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমান আনতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে। আর আমি কি তোমাদেরকে সে বিষয়ে জানাব না যখন সেটা করবে তখন তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে? (সেটা হচ্ছে) তোমরা নিজেদের মধ্যে সালামের অধিক প্রচলন কর।” (বুখারি, মুসলিম)

জান্নাতীদের একে অপরের মাঝে সম্ভাষণের মাধ্যম হবে সালাম। জান্নাতীরা একে অপরকে সালাম প্রদান করবেন এবং আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর ফেরেশতারা তাদেরকে সালাম জানাবেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, “সেখানে তাদের প্রথম কথা হবে “পবিত্রতা আপনার হে আল্লাহ” এবং তাদের সম্ভাষণ হবে সালাম। আর তাদের শেষ কথা হবে এটাই যে “সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।” (সুরা ইউনুস: ১০)

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “পরম দয়ালু প্রতিপালকের পক্ষ থেকে জানানো হচ্ছে সালাম।” (সুরা ইয়াসিন: ৫৮)

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন “তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমাদের কল্যাণ হোক। তোমরা সেখানে (জান্নাতে) চিরদিনের জন্য প্রবেশ কর।” (সুরা যুমার: ৭৩) সম্ভাষণার্থে সালামের পরিবর্তে অন্য শব্দ ব্যবহার করা মাকরুহ।

কে কাকে সালাম প্রদান করতে পারবেন: মুসলিমরা একে অপরকে সালাম প্রদান করতে পারবেন। এক্ষেত্রে মাসনুন নিয়ম হচ্ছে বাহনে চড়ে ভ্রমণরত ব্যক্তি পায়ে হাঁটা ব্যক্তিকে সালাম দেবেন, পায়ে হাঁটা ব্যক্তি বসে থাকা ব্যক্তিকে সালাম দেবেন, কম সংখ্যক লোক বেশী সংখ্যক লোককে সালাম দেবেন, এক জন ব্যক্তি একটি কাফেলাকে সালাম দেবেন এবং ছোটরা বড়দের সালাম দেবে। তবে বড়রাও ছোটদেরকে সালাম শিক্ষা দেয়ার জন্য সালাম দিতে পারবেন। নবী করীম (সা.) থেকে ছোটদেরকে সালাম শিক্ষা দানের উদ্দেশ্যে বড়দের সালাম প্রদান বিষয়ে হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

কাকে সালাম প্রদান করা যাবে না: মুসলিম ব্যতীত অন্য কাউকে সালাম প্রদান করা হারাম। কারণ সালাম শুধু মুসলিমদের মধ্যে প্রচলন ঘটানোর জন্য হাদীসে এসেছে। তবে কোনো ভিন্ন ধর্মের জালিম শাসক যদি সালাম প্রদান করতে বাধ্য করে এবং সালাম না দিলে তার পক্ষ থেকে জুলুমের শিকার হওয়ার আশঙ্কা করলে তাকে সালাম দেয়া জায়েজ। আর আহলে কিতাবদের সালাম দেয়া পূর্বে জায়েজ ছিল। কিন্তু বর্তমানে যেহেতু খাঁটি আহলে কিতাব নেই, সুতরাং বর্তমান ইহুদী ও খ্রিস্টানদের সালাম দেয়াও জায়েজ নেই। তবে কোনো প্রয়োজনে অমুসলিমদের সালাম দিতে হলে এভাবে সালাম দেবে “আসসালামু আলা মানিত্তাবাআল হুদা” অর্থাৎ “শান্তি বর্ষিত হোক হেদায়াতের পথ অনুসরণকারীর ওপর”। আর কোনো অমুসলিম কোনো মুসলিমকে সালাম প্রদান করলে উত্তরে শুধু “ওয়া আলাইকুম” বলবে।

কখন সালাম দেয়া মাকরুহ: প্রত্যেক মুসলিম প্রত্যেকবার সাক্ষাতের সময় পরস্পরকে সালাম প্রদান করবেন, এমনকি দেয়ালের পেছনে আড়াল হয়ে পুনরায় সাক্ষাৎ হলেও। তবে দিনে ও রাতে কয়েকটি সময় আছে যখন সালাম প্রদান করা মাকরুহ। এ সময়গুলো নিম্নরূপ:

১. নামাজ পড়া অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে সালাম দেয়া উচিত নয়। কারণ নামাজের অবস্থায় ওই ব্যক্তি এর উত্তর দিতে পারবেন না। উত্তর দিলে নামাজ ভেঙে যাবে।

২. কেউ প্রশ্রাব-পায়খানা করছে এমতাবস্থায় তাকে সালাম দেয়া যাবে না। কারণ তখন জবাব দেয়ার কোনো উপায় নেই। সালামও এক ধরনের জিকির। প্রশ্রাব-পায়খানার সময় জিকির করা যাবে না।

৩. ওজুরত অবস্থায় কাউকে সালাম দেয়া যাবে না। এতে তার ওজুর মনোযোগ নষ্ট হবে; ওজুতে ভুলও হতে পারে।

৪. কেউ খাবার খাচ্ছে এমতাবস্থায়ও সালাম দেয়া যাবে না। এ সময় সালাম দিতে নিষেধ করা হয়েছে হাদীসে।

৫. কোরআন তিলাওয়াত করা অবস্থায় কোনো ব্যক্তিকে সালাম দেয়া উচিৎ নয়।

৬. জিকির ও মোরাকাবারত ব্যক্তিকে সালাম দেয়া উচিৎ নয়।

৭. ওয়াজ ও নসিহত শোনা অবস্থায় সালাম দেয়া উচিৎ নয়।

৮. দ্বীনি শিক্ষার মজলিসে মশগুল ব্যক্তিকে সালাম দেয়া উচিৎ নয়।

৯. আজানরত অবস্থায় মুয়াজ্জিনকে সালাম দেয়া যাবে না।

১০. কেউ কোনো জরুরী হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত তখনো সালাম দেয়া যাবে না। সালামের উত্তর দেয়া যেহেতু ওয়াজিব এজন্য যাকে সালাম দেয়া হচ্ছে তার অবস্থাটি বিশেষ বিবেচনায় রাখাই হচ্ছে সালামের মূল আদব।

সালামের জবাব দানের হুকুম: সালাম দেয়া সুন্নাত হলেও এর জবাব দেয়া ওয়াজিব।

নয়াশতাব্দী/জিএস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ