ঢাকা, সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১, ৮ মহররম ১৪৪৬

কোরবানীর জরুরী মাসায়েল

প্রকাশনার সময়: ১৬ জুন ২০২৪, ২২:০৫

কোরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কোরবানী করা ওয়াজিব। এর গোশত বিতরণ করা ও খাওয়া সুন্নত। ঈদ-উল আজহার নামকরণই করা হয়েছে এ মহান ইবাদতের নামে। আল্লাহ তায়ালা এ দিনে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি কোরবানী করারও হুকুম দিয়েছেন— ‘সুতরাং তুমি নিজ প্রতিপালকের (সন্তুষ্টি অর্জনের) জন্য নামাজ পড় ও কোরবানী দাও।’ (সুরা কাউসার: ০২)।

প্রথমে নামাজের হুকুম, তারপর কোরবানীর। যেন বলা হচ্ছে— ‘নামাজের মাধ্যমে প্রথমে আল্লাহ তায়ালার সামনে আত্মনিবেদিত হও, তারপর সে আত্মনিবেদনের নিদর্শনস্বরূপ কোরবানী কর।’

কোরবানী কী

‘কোরবানী’ কুরবান শব্দ থেকে। এর অর্থ হলো নিকটবর্তী হওয়া, কারো নৈকট্য লাভ করা। পরিভাষায় কোরবানী বলা হয়, ‘আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের আশায় নির্দিষ্ট দিনে পশু জবাই করা’।

কোরবানীর ফজিলত

যায়েদ বিন আরকাম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা (সাহাবীগণ) বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! কোরবানীর হাকিকত কী? রাসুল (সা.) বললেন, ‘এটি তোমাদের পিতা আদম (আ.) -এর সুন্নত’। সাহাবীগণ বললেন, এতে আমাদের কী লাভ? নবীজি (সা.) বললেন, (কোরবানীর পশুর) ‘প্রতিটি লোমের বিনিময়ে তোমাদেরকে একটি করে নেকী দেয়া হবে’। সাহাবীগণ বললেন, ভেড়ার ক্ষেত্রেও কি একই বিধান? নবীজি (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, এরও প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকী দেয়া হবে।’ (মেশকাত: ১/১২৯)

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানী না করা

সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই মহান ইবাদত পালন করে না তার ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে— ‘যে ব্যক্তি কোরবানী করার সামর্থ্য রাখে কিন্তু কোরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২৩)

কাদের ওপর ওয়াজিব

প্রত্যেক স্বাধীন, মুসলমান, মুকিম যারা কোরবানীর দিনগুলোতে নেসাব পরিমাণ মালের মালিক তাদের ওপর কোরবানী ওয়াজিব। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া: ৫/৩৩৬)

ওয়াজিব হওয়ার সময়

কোরবানী ওয়াজিব হওয়ার সময় হলো, কোরবানীর দিন। গ্রামবাসীদের জন্য সূর্যোদয়ের পর আর শহরবাসীদের জন্য ঈদের নামাজের পর। সুতরাং যে ব্যক্তি কোরবানীর দিনগুলোকে এমতাবস্থায় পাবে যে, ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ তার মাঝে বিদ্যমান তাহলে তার ওপর কোরবানী ওয়াজিব। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৮)

কোরবানীর নেসাব

স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) তোলা। আর টাকা-পয়সা ও অন্য বস্তুর ক্ষেত্রে নেসাব হলো, এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমপরিমাণ হওয়া। স্বর্ণ ও রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার ওপর কোরবানী করা ওয়াজিব। (ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া: ১৭/৪০৫)

কোন পশু দিয়ে কোরবানী করবেন

কোরবানীর জন্য নির্ধারিত পশু ছয়টি। যেমন: গরু (গাভী, ষাঁড়, বলদ) মহিষ, ভেড়া, ছাগল (খাসী, পাঠা) দুম্বা ও উট। এই ছয় প্রকার গৃহপালিত পশু কোরবানী করা জায়েজ। এ ছাড়া অন্য কোনো হালাল প্রাণী (হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি) কোরবানী করা জায়েজ নেই। (আল-বাহরুর রায়েক: ৮/৩২৪)

কোন পশু দ্বারা কোরবানী করা উত্তম

গরু, মহিষ, উট, ছাগল ভেড়া ও দুম্বা; এই ছয় ধরনের পশু কোরবানী করা জায়েজ। সামর্থ্য অনুযায়ী এই ছয় প্রকারের যে কোনো পশু কোরবানী করলেই কোরবানী আদায় হয়ে যাবে। তবে উত্তম হলো, হূষ্টপুষ্ট পশু কোরবানী করা। প্রথমে উট বা ভেড়া তারপর গরু তারপর ছাগল। (শরহে মুখতাসারিত তহাবি: ৭/৩২৬) তবে গরুতে সাত জনে শরিক হওয়ার চেয়ে ছাগল একা কোরবানী করা উত্তম যখন মূল্য বরাবর হবে। (ফতোয়ায়ে শামী: ৯/৫৩৪)

পশুর বয়স

গরু ও মহিষের দুই বছর, উটের পাঁচ বছর আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার এক বছরের কম হলে এর দ্বারা কোরবানী করা জায়েজ হবে না। ছয় মাসের ভেড়া ও দুম্বা মোটা তাজা হওয়ায় দেখতে যদি এক বছরের মনে হয় তাহলে ছয় মাসের ভেড়া, দুম্বাও কোরবানী করা জায়েজ। কিন্তু দেখতে যদি নাদুস-নুদুস না হয় তাহলে এগুলোও এক বছরের পূর্বে কোরবানী করা জায়েজ নেই। (ফতোয়ায়ে শামি: ৯/৫৩৪, শরহে মুখতাসারিত তহাবি: ৭/৩২৬) উল্লেখ্য, ছাগলের এক বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কোরবানী জায়েজ নেই। (কিফায়াতুল মুফতি: ৮/১৯৬)

কখন কোরবানী করবেন

কোরবানী করার মোট সময় তিন দিন। যেমন: ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ। এই তিন দিনের রাত ও দিনের যে কোনো সময় কোরবানী করা যাবে। (শরহে মুখতাসারিত তহাবি: ৭/৩৩৩)

কখন করা উত্তম

কোরবানীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনে কোরবানী করা বৈধ হলেও প্রথম দিনই ঈদের নামাজের পর কোরবানী করা উত্তম। অনুরূপ রাতের তুলনায় দিনে কোরবানী করা উত্তম। (খুলাসাতুল ফতোয়া: ৪/৩১১)

সাত শরীক ও বেজোড় সংখ্যা

শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি গরু, মহিষ বা উটে সর্বোচ্চ সাত অংশীদার মিলে কোরবানী করতে পারবে। এর চেয়ে বেশী অংশীদার হলে কারো কোরবানী সহিহ হবে না। সাতের নিচে দুই-চার বা ছয় ভাগেও কোরবানী দিতে পারবে। এতে বেজোড় সংখ্যা হওয়া জরুরী নয়। (কিফায়াতুল মুফতি: ৮/১৮৭)

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কোরবানী

ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি তার নেসাব পরিমাণ সম্পত্তি থেকে ঋণের অংশ আলাদা করার পর যদি নেসাব কমে যায় তাহলে তার ওপর কোরবানী ওয়াজিব নয়। কিন্তু যদি ঋণের টাকা আলাদা করা সত্ত্বেও নেসাব বাকী থাকে তাহলে তার ওপর কোরবানী ওয়াজিব। (আহসানুল ফতোয়া: ৭/৫০৭)

গরীবের কোরবানী

গরীব ব্যক্তি যদি কোরবানী করার নিয়তে পশু ক্রয় করে তাহলে তার ওপর কোরবানী ওয়াজিব হয়ে যায়। এমনকি ওই নির্দিষ্ট পশুই কোরবানী করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। (কিতাবুল মাসায়েল: ২/৩০৪)

কোরবানীর সঙ্গে আকীকা

কোরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকিকার নিয়তে শরিক হতে পারবে। এতে কোরবানী ও আকীকা দুটোই সহিহ হবে। (ফতোয়ায়ে রহিমিয়্যা: ২/৮০)

কোরবানীর সঙ্গে ওলিমা

কেউ যদি কোরবানীর বড় পশু অর্থাৎ গরু, মহিষ ও উটে ওলিমার অংশ রাখে তাহলে তা জায়েজ আছে। এতে ওলিমার কারণে কোরবানীর পশুতে কোনো প্রভাব পড়বে না। (কিতাবুল মাসায়েল: ২/৩১৪)

সন্তান ও স্ত্রীদের কোরবানী

ছোট নাবালেগ বাচ্চাদের পক্ষ থেকে পিতা কোরবানী দেয়া ওয়াজিব নয়। তবে দেয়া ভালো। অনুরূপ স্বামী তার স্ত্রীর পক্ষ থেকে কোরবানী করা আবশ্যক নয়। (ফতোয়ায়ে রহিমিয়্যা: ২/৮৭) নাবালেগ ছেলে যদি নেসাব পরিমাণ মালের মালিকও হয় তবুও বিশুদ্ধ মতানুসারে তার ওপর কোরবানী ওয়াজিব নয়। (বাদায়েউস সানায়ে: ৫/৬৪)

নয়া শতাব্দী/এসআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ