ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪, ৭ আষাঢ় ১৪৩১, ১৪ জিলহজ ১৪৪৫
পবিত্র জিলহজ মাস

যে ১০ দিনের আমল সবচেয়ে দামী

প্রকাশনার সময়: ০৭ জুন ২০২৪, ১৭:৫০

মরা জিলকদ মাসের শেষ ভাগে অবস্থান করছি। আর আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে জিলহজ মাস। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য জিলহজ মাসের প্রথম দশকের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা উদাসীনতায় পড়ে থাকি। আমরা কোরবানী, ঈদের কেনাকাটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। অথচ আল্লাহ তায়ালা আল-কোরআনে একাধিকবার এবং আল্লাহর রাসুল (সা.) হাদিসে বারবার এই জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের মাহাত্ম্য এবং এ সময়ের আমল নিয়ে ঈমানদারদের অবহিত করেছেন।

এই দশকের কসম করেছেন আল্লাহতায়ালা

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘শপথ ভোরবেলার! শপথ দশ রাতের!’ (সুরা ফাজর: ১-২) অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এই কসমকৃত দশ রাত দ্বারা জিলহজের প্রথম দশ রাতকেই বোঝানো হয়েছে। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, দশ রাত দ্বারা জিলহজের প্রথম দশককেই বুঝানো হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), ইবনুয যুবাইর, মুজাহিদসহ অনেক সালাফের মত এটি।

দেখুন, বিধান হলো— কোনো বান্দার জন্য বৈধ নয় আল্লাহর নাম ছাড়া অন্য কারো নামে শপথ করা। কিন্তু আল্লাহ তার যে কোনো সৃষ্টির নামে কসম করতে পারেন। এ কসমের মাধ্যমে আল্লাহর কথার মূল্য বাড়ার কিছু নেই, কারণ আল্লাহর কথা সব সময়ের জন্যই দামী ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এতে কসমকৃত জিনিসের গুরুত্ব ও দাম বেড়ে যায়। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘ত্বীন ফলের কসম, জায়তুনের কসম এবং নিরাপদ শহরের কসম অর্থাৎ মক্কা শহর)। উপরোক্ত আয়াতে জিলহজের প্রথম দশ রাতের কসম করে আল্লাহ তায়ালা এ দশ রাতের গুরুত্বই আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন।

আরেক সুরায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা যেন নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর স্মরণ করে।’ (সুরা হজ: ২৮) এখানেও অধিকাংশ মুফাসসিরের মত, ‘এ নির্দিষ্ট দিনসমূহ দ্বারা উদ্দেশ্য জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)

আল্লাহ তায়ালা দুই সুরায় এই দশ দিনের গুরুত্ব সম্পর্কে আমাদের ইঙ্গিত করেছেন। আমাদের উচিৎ অন্য সময়ের চাইতে আরো বেশী চেষ্টা ও মোজাহাদার মাধ্যমে এ দিনগুলোতে বিপুল পরিমাণ ইবাদতে নিয়োজিত থাকা। যাতে আমরা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করতে পারি।

হাদিসের এই দশকের আমলের গুরুত্ব

ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এ দিনগুলোর (জিলহজের প্রথম ১০ দিনের) আমলের তুলনায় কোনো আমলই অন্য কোনো সময় উত্তম নয়। তারা বললেন, জিহাদও না? তিনি বললেন, জিহাদও না, তবে যে ব্যক্তি নিজের জানের শঙ্কা ও সম্পদ নিয়ে বের হয়েছে, অতঃপর কিছু নিয়েই ফিরে আসেনি।’ (বুখারি)

রাসুল (সা.) আরো বলেছেন, ‘এমন কোনো আমল নেই যা আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়, অধিক পবিত্র, অধিক মর্যাদাপূর্ণ এ দশ দিনের আমলের চেয়ে।’ (বুখারি, তাবারানি, মুসনাদে আহমদ)

তাই তো সৌদি আরবের সাবেক গ্রান্ড মুফতি শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রহ.) বলেছেন, ‘মানুষ রমজানের শেষ দশককে কাজে লাগানোর জন্য ইতেকাফ করে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রেখে মসজিদে বসে যায়, তাহাজ্জুদ পড়ে, জিকির করে, তিলাওয়াত করে। অন্য সময়ের চেয়ে বেশী ইবাদতের চেষ্টা করে। অথচ কোনো সন্দেহ নেই ওই দশ রাতের চেয়ে এই দশ দিনের আমল আল্লাহর কাছে অনেক বেশী প্রিয়। তথাপি অধিকাংশ আলেম পর্যন্ত এ বিষয়ে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে গিয়ে যতটা গুরুত্ব দেন রমজানের শেষ দশককে ততটা গুরুত্ব দেন না এই দশককে। আফসোস, অধিকাংশ মুসলমান জিলহজের প্রথম দশ দিন সম্বন্ধে জানেই না।’

তাই জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন আমাদের অসাধারণ ইবাদতময় করে কাটানো উচিৎ। বিচিত্র ইবাদতে সুশোভিত করা উচিৎ। আমাদের সব ইবাদতের পরিমাণ অন্য সময়ের তুলনায় এ সময়ে আরো বাড়িয়ে দিতে হবে। কারণ এ সময় Invest কম Benefit বেশী।

যে কারণে এই দশক এত গুরুত্বপূর্ণ

ইসলামের পাঁচটি রুকনের বাস্তবায়ন একত্রিতভাবে এ দশকেই দেখা যায়। অন্য কোনো সময়ে যা হয় না। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ) ফাতহুল বারি গ্রন্থে বলেন, ‘জিলহজের দশকের বৈশিষ্ট্যের কারণ যা প্রতীয়মান হয় তা হলো, এতে সব মৌলিক ইবাদতের সন্নিবেশ ঘটে। যথা— সালাত, সিয়াম, সদকা, হজ ইত্যাদি। অন্য কোনো দিন এতগুলো ইবাদতের সমাবেশ ঘটে না।’

এই দশকে করণীয়

এই দশ দিনে সব রকমের নেক আমল বেশী বেশী করা দরকার। সারা বছর যে নফল-মুস্তাহাব কাজগুলো করা হয়ে ওঠে না, সেগুলোও করা দরকার এ সময়ে। তথাপি এ সময়ের প্রধান ইবাদতগুলো এভাবে আমরা তুলে ধরতে পারি।

তাকবীর পাঠ করা

নবী (সা.) বলেন, ‘এ দশ দিনে (নেক) আমল করার চেয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে অধিক প্রিয় ও মহান আর কোনো আমল নেই। তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) তাকবীর (আল্লাহু আকবার) তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশী করে আদায় কর। (মুসনাদে আহমাদ) অর্থাৎ ‘সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ, ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর।’

সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) ও আবু হুরাইরা (রা.) জিলহজ মাসের প্রথম দশকে বাজারে যেতেন ও তাকবীর পাঠ করতেন, লোকজনও তাদের অনুসরণ করে তাকবীর পাঠ করতেন। এভাবে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর এই দুই প্রিয় সাহাবী লোকজনকে তাকবীর পাঠের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। (বুখারি)

তাই আমরাও সাহাবায়ে কেরামের অনুকরণে এ তাকবীরটি নিজেরা পাঠ করার পাশাপাশি অন্যকেও উৎসাহিত করব। তারপর ৯ জিলহজে আর একটা যোগ হবে তা হলো ‘তাকবীরে তাশরীক’। ৯ জিলহজ ফজর থেকে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত একাকী অথবা জামাতে, নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সবাইকে ফরজ নামজের পর একবার করে পড়তে হবে।

তাকবীরে তাশরীক: ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার; লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু; ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার; ওয়ালিল্লাহিল হামদ।’ অর্থাৎ ‘আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান; আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নাই; আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান এবং আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা।’

বেশী বেশী জিকির করা

উপরোক্ত দুই তাকবীরের পাশাপাশি আমরা সাধারণ জিকিরগুলো তথা সকাল-সন্ধ্যার জিকির, পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পরের জিকির, শোয়ার আগে-পরের জিকিরসহ বিভিন্ন অবস্থার জিকিরগুলো এবং মাসনুন দোয়াগুলো গুরুত্ব দিয়ে পড়ব। বেশী বেশী দরুদ ও ইস্তেগফার পড়ব।

রোজা রাখা

ঈদের আগের দিন পর্যন্ত ৯ দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। ইমাম নববি (রহ.) বলেন, ‘এ কয়দিন রোজা রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ মুস্তাহাব। তার মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান হলো নবম (আরাফার) দিন।’ আমাদের পূর্বসুরী নেককার বান্দারা এ ৯ দিনই নফল রোজা রাখতেন। রোজা রাখতেন মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.), ইমাম আতা (রহ.) ও ইমাম মুজাহিদ (রহ.)সহ সব যুগের আল্লাহর প্রিয় বান্দারা।

এই দশ দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো আরাফার রোজা রাখা। ওই ৯ দিন কমবেশী যে কয়টা পারি না পারি এ দিনটি অবশ্যই রোজা রাখব। ভুলে যাবেন না, রোজা এক দিনের, কিন্তু গুনাহ মাফ দুই বছরের! সুবহানাল্লাহ!

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আরাফাত দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, তিনি এর দ্বারা আগের এক বছরের ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করবেন।’ (সহিহ মুসলিম)

সালাত আদায়

এ দশ দিন আমরা তাকবীর উলার সঙ্গে গুরুত্ব সহকারে জামাতের সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ব এবং সুন্নত-নফল সালাতও বেশী বেশী পড়ার চেষ্টা করব। খুশু-খুজুর সঙ্গে কোয়ালিটিফুল নামাজ আদায়ের চেষ্টা করব। প্রত্যেকে নামাজে অন্য সময়ের চেয়ে বেশী এফোর্ট দেব। যারা জুমাবার ছাড়া মসজিদে আসি না, তারা তওবা করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজী হয়ে যাব। যারা পাঁচ ওয়াক্ত পড়ি তবে সবগুলো মসজিদে পড়ি না, ফজরসহ সবগুলো মসজিদে পড়ার চেষ্টা করব। যারা জামাতের সঙ্গে পড়ি তারা তাহাজ্জুদ প্রতিদিন পড়ার চেষ্টা করব। এভাবে সবাই যার যার অবস্থান থেকে নামাজে উন্নতি ঘটাব।

দান-সদকা

আমরা এ দশ দিন দান-সদকার পরিমাণ আগের চেয়ে বাড়িয়ে দেব। প্রতিদিন দান করার অভ্যাসের কথা তো আমি বরাবরই বলে আসছি, প্রতিদিন সকালে হলে ভালো, না হয় যে কোনো সময় সামান্য হলেও দান করব। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা ফেরেশতা দোয়া করতে থাকেন, ‘হে আল্লাহ, দানকারীর সম্পদ বাড়িয়ে দিন।’ সুতরাং এ দোয়া লাভের চেষ্টা করব।

এখন এই পবিত্র সময়ে বলব, যে পরিমাণ রোজ দান করেন, তার পরিমাণ বাড়িয়ে দিন।

কোরআন তিলাওয়াত

আমরা এ দিনগুলোতে পূর্বের চাইতে বেশী বেশী কোরআন তিলাওয়াত করব। চেষ্টা করব এ ৯ দিনে এক খতম কোরআন তিলাওয়াত করতে। আমার মুসল্লি ভাইদের মধ্যে যারা এই সংকল্পে সফল হবেন, তাদেরকে ইনশাআল্লাহ এক সেট দামী তাফসীর পুরস্কার দেব।

গুনাহমুক্ত থাকা

এ দশ দিন ইবাদতের পাশাপাশি গুনাহ থেকে বিরত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমাদের সালাফরা বলতেন, ‘মানুষ বুজুর্গি খোঁজে বিভিন্ন ইবাদতের মধ্যে। আসলে প্রকৃত বুজুর্গি গুনাহ থেকে বিরত থাকার মধ্যে নিহিত।’

তাই আসুন আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়, বছরের শ্রেষ্ঠ দশক, জিলহজের প্রথম ১০ দিনে ইবাদতে বিশেষভাবে যত্নবান হই। সব ধরনের ইবাদতের পরিমাণ বাড়িয়ে দেই এবং বিরত থাকি সকল প্রকার গুনাহের কাজ থেকে। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন।

৩১ মে ২০২৪ টঙ্গীর আন-নূর জামে মসজিদে কৃত জুমার আলোচনা থেকে অনুলিখন— মুহা. আব্দুল খালেক আশিক

নয়া শতাব্দী/এসআর

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ