ঢাকা, মঙ্গলবার, ৫ মার্চ ২০২৪, ২১ ফাল্গুন ১৪৩০, ২৩ শাবান ১৪৪৫
জুমার বয়ান থেকে

আসুন দাওয়াত ও তাবলিগ করি বিভেদ ভুলে

প্রকাশনার সময়: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৮:১৬

নবুয়্যত প্রাপ্তির আগ মুহূর্তে মক্কার অবস্থা ছিল ঘোর অন্ধকার। বেশির ভাগ মানুষ ছিল জাহেল বা অজ্ঞ। তাদের মাঝে সাদা-কালো, উঁচু-নিচু, নারী-পুরুষ— এভাবে একজনের ওপর ছিল আরেকজনের প্রাধান্য। বংশীয় দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতো তারা প্রতিমুহূর্তে। তাদের মাঝে কোনো ইনসাফ ছিল না। সবলরা দুর্বলদের প্রতি জুলুম করত।

এ অবস্থা দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.) চিন্তিত হয়ে ভাবতেন, কিভাবে এ জাতি মুক্তি পাবে। কিভাবে তারা আলোর মুখ দেখবে। তাই প্রায়শই একাকিত্বে সময় কাটানোর জন্য হেরা গুহায় ধ্যান করতেন। ভাবতেন, চিন্তামগ্ন হতেন- কী করে আসবে মানবতার মুক্তি?

সহিহ বুখারিতে অহির সূচনা কিভাবে শীর্ষক অধ্যায়ে সংকলিত হাদিসে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘(অহি নাজিলের প্রাক্কালে) আমাকে নির্জনতাপ্রিয় বানিয়ে দেয়া হয়।’ তাঁর যখন বয়স ৪০ বছর পূর্ণ হয়, তখন প্রথম অহি নাজিল হয় রমজান মাসে। এভাবেই আসমানি পয়গামের সূচনা।

নবুয়্যত পাওয়ার পর প্রথমে কাছের জনদের মধ্যে সর্বপ্রথম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতে ইসলাম কবুল করেন তাঁর প্রাণপ্রিয় সহধর্মিণী খাদিজা (রা.)। এরপর আবু বকর সিদ্দিক, আলী বিন আবি তালিব, যায়িদ বিন হারেসা (রা.) প্রমুখ সাহাবিরা ইসলাম গ্রহণ করেন।

এরপর আসে আসমানি প্রত্যাদেশ— আল্লাহ তায়ালা আদেশ করেন, ‘আপনি নিকটতম আত্মীয়দের সতর্ক করুন।’ (সুরা আশ-শুয়ারা: ২১৪) এ আয়াত নাজিলের মাধ্যমে প্রকাশ্যে দাওয়াতের নির্দেশনা পেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে কোরাইশ গোত্রের বিভিন্ন শাখাকে সমবেত করেন। সবাই একত্রিত হলে তিনি তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি যদি বলি যে এ পাহাড়ের অপর পাশ থেকে একটি শত্রুদল তোমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। যে কোনো সময় তারা তোমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাহলে তোমরা কি তা বিশ্বাস করবে?’ সকলেই সমস্বরে বলল, হ্যাঁ, অবশ্যই আমরা বিশ্বাস করব।

এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আমি তোমাদের এক ভীষণ শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করছি। (তোমরা স্বীকার কর যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই এবং মূর্তিপূজা ত্যাগ কর)’। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এ দাওয়াত শুনে আবু লাহাব বলে উঠল, তুমি ধ্বংস হও। এজন্যই কি তুমি আমাদের একত্র করেছ? অতঃপর আবু লাহাব রাসুল (স.)-কে পাথর মারতে উদ্যত হয়। আবু লাহাবের এ দম্ভোক্তি ও আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহ তায়ালা সুরা লাহাব নাজিল করেন। যেখানে খোদ আবু লাহাব ও তার স্ত্রীর ধ্বংসের ঘোষণা দেয়া হয়। (সহিহ বুখারি)

ইতিহাস প্রমাণ করেছে, রাসুল (সা.) ধ্বংস হননি, বরং তাঁর দ্বীন পৌঁছে গেছে পৃথিবীর সর্বত্র। পক্ষান্তরে ধ্বংস হয়ে গেছে আবু লাহাব। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে তার বংশ। অথচ রাসুল (সা.)-এর আনিত দ্বীন আজও সংরক্ষিত। এভাবে সংরক্ষিত থাকবে কিয়ামত অবধি।

প্রশ্ন হলো, এই দ্বীন কিভাবে সংরক্ষিত ও প্রচারিত হয়েছে? এই দ্বীন সংরক্ষিত অবস্থায় এ পর্যন্ত এসেছে দাওয়াতের মাধ্যমে। আরবিতে যাকে বলে ‘তাবলিগ’। বিদায় হজের ভাষণে রাসুলুল্লাহ (সা.) সমবেত লক্ষাধিক সাহাবির উদ্দেশে বলেন, ‘আমি কি পৌঁছে দিয়েছি।’ সমস্বরে উপস্থিত সাহাবিরা (রা.) বলে ওঠেন— ‘আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত পৌঁছে দিয়েছেন।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) বললে, ‘হে আল্লাহ, আপনি সাক্ষী থাকুন।’ এরপর রাসুল (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বিদায় গ্রহণপূর্বক বললেন, ‘তোমরা আমার কথা যারা শুনেছ তারা যারা শুনেনি তাদের কাছে পৌঁছে দাও।’ রাসুল (সা.)-এর কথা শেষ হওয়া মাত্র তাদের ঘোড়াগুলো (বাহনগুলো) ঘুরিয়ে পৃথিবীর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছেন পৃথিবীবাসীর কাছে দ্বীন পৌঁছানোর জন্য। তাই তো চীন, তুরস্ক, ইয়ামেনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাহাবিদের কবর পাওয়া। দ্বীন এমনি এমনি এ পর্যন্ত আসেনি! এসেছে দাওয়াত ও তাবলিগের মাধ্যমে।

তাবলিগ মানে পৌঁছে দেয়া। লক্ষ্য করুন— আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুলকে বলেন, ‘হে রাসুল, তোমার রবের পক্ষ থেকে তোমার নিকট যা নাজিল করা হয়েছে, তা পৌঁছে দাও। (সুরা মায়েদা: ৬৭) আল্লাহ তায়ালা নিজে রাসুল (সা.) কে বললেন ‘পৌঁছে দিন’। আর রাসুল (সা.) তাঁর সাথি-সাহাবিদের বললেন, ‘পৌঁছে দাও’। তাবলিগ করো।

রাসুল (সা.)-এর এ আমানত সাহাবিদের তাবলিগের মাধমে আমাদের কাছে এসেছে। আমরা সেই পন্থা অবলম্বন করে কেউ লেখালেখি করে, কেউ বক্তৃতার মাধ্যমে, কেউ দাওয়াত ও তাবলিগ করে, আবার কেউ ইসলামি রাজনীতির মাধ্যমে, কেউ সহি হাদিস প্রচারের করে, কেউ আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পৃক্ত করছি। যে যেভাবেই আল্লাহর দিকে মানুষকে ডাকছেন তিনিই তাবলিগ বা দাওয়াহর কাজ করছেন।

এ কাজের মর্যাদা ও মাহাত্ম্য সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, ‘ওই ব্যক্তির চেয়ে কার কথা উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর পথে ডাকে (দাওয়াত দেয়)...।’ (সুরা হা মিম সাজদাহ: ৩৩)

তাই আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে অফলাইনে বা অনলাইনে আল্লাহর জন্য ইখলাসের সঙ্গে যে যে কাজই করছেন সবই দাওয়াহ ইলাল্লাহর অন্তর্ভুক্ত। এসবই দাওয়াহ, এসবই তাবলিগ।

মনে রাখতে হবে আমরা আল্লাহর দিকেই ডাকছি। কিন্তু একটা ব্যানার বা প্ল্যাটফর্ম থাকলে ঐক্যবদ্ধ হতে সুবিধা হয়। কাজের মধ্যে শৃঙ্খলা আসে এবং কাজে প্রসারতা বৃদ্ধি পায়। এর ওপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন ইসলামিক দল বা কাফেলা তৈরি হয়েছে। এটা ইসলাম সমর্থন করে। কিন্তু আমার দলে আসলেই আপনি কামিয়াব আর অন্য দলে বা কাফেলায় গেলে আপনি ব্যর্থ, এটা ইসলাম সমর্থন করে না। কিন্তু আমরা এখানেই বিচ্যুত, শয়তান এখানেই জয়ী যে সে আমাদের ইখলাস নষ্ট করতে পেরেছে। আমাদেরকে ইসলামের নামে বিভক্ত করতে পেরেছে।

সম্ভবত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এর একটি উক্তি এমন, ‘আপনি তখনই সত্যিকার দাঈ ইলাল্লাহ হিসেবে গণ্য হবেন যখন আপনার অপছন্দনীয় কোনো ব্যক্তি আল্লাহর কাজ করছে দেখলে আপনি তাতে খুশি হবেন। কিন্তু আফসোস পৃথিবীর প্রায় দেশেই এ সংস্কৃতি চালু থাকলেও ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশে এটা বিরল।

তাই আজ আমাদের ওপর বিভিন্ন বিজাতীয় সংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চলছে। ইসলামপন্থিরা বিভিন্নভাবে জুলুমের শিকার হচ্ছি। কিন্তু সকল মুসলিম এক হয়ে প্রতিবাদ করতে পারছি না। আমরা আত্মকলহে লিপ্ত হয়ে একে অপরের পেছনে লেগে আছি। দাওয়াতের কাজ ছেড়ে দিয়েছি। আজ সত্য কথা বলার লোকগুলো নীরব হয়ে যাচ্ছে। তাই বাতিলরা মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহস পাচ্ছে।

আজ টঙ্গীর তুরাগতীরে তাবলিগি ইজতেমা হচ্ছে আর আমাদের একশ্রেণির লোক নিন্দা করছি— ওটা পিকনিক, ওটা শিরক, বিদআত ইত্যাদি। মনে রাখবেন, হজে বিপুল লোকের সমাগম দেখে যাদের কলিজায় আঘাত লাগে, কোরআনের কোকিলের মাহফিলে লাখ লাখ মানুষের বিশাল স্রোত দেখেও তাদেরই লাগে। চরমোনাইর মাহফিল দেখেও তাদেরই জ্বলে। অনুরূপ টঙ্গীর ইজতেমা দেখেও তাদেরই হিংসা জাগে অন্তরে। সুতরাং ইসলামের শত্রুরা সবার জন্যই কমন।

আমাদের যুবসমাজ নেশায় জড়াচ্ছে, বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে, অনেক মানুষ মসজিদে আসে না। যারা দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ তাদেরকে মসজিদমুখী করছে এই তাবলিগি কাফেলার সহজ-সরল লোকরাই। বেনামাজিদের মসজিদে এনে নামাজি তারাই বানাচ্ছে। তাই তাদের কাজকে অবজ্ঞা না করে তাদের উৎসাহ দিন। আগে মানুষকে মসজিদমুখী করুন। তারপর আপনি সহিহ আকিদার দাওয়াত দেন। ইসলামের আন্দোলন শেখান।

মানুষ মাত্রই ভুল হয়, তাদেরও কিছু ভুল আছে। আমরাও কেউ ভুলের ঊর্ধ্বে নই। আপনি শত্রু হয়ে সমালোচনা নয়, বন্ধু হয়ে আত্মসমালোচনা করে সংশোধনের চেষ্টা করুন। খামোখা অন্যের ভুল ধরা, সমালোচনা আর ফতোয়া দেয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যারা আল্লাহর দিকে ডাকছে তাদেরকে বন্ধু ভাবতে হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। এজন্য যে তোমরা ভালো কাজের আদেশ দাও এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ কর।’ (সুরা আলে ইমরান: ১১০)

আসুন আল্লাহর আদেশ ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আমানত দাওয়াতের কাজকে বেগবান করতে একে অপরকে সহযোগিতা করি। একদিন রাসুল (সা.) বললেন, ‘হে আলী, তোমার দ্বারা একটি লোকও যদি পরিবর্তন হয়, দ্বীনের পথে ফিরে আসে, তা একটি লাল উটের চেয়েও উত্তম।’

তাই খেয়াল রাখা উচিত, আমার আচরণে যেন কেউ ইসলামে আসে, ইসলাম থেকে দূরে সরে না যায়। একজন দায়ী হিসেবে আমাদের ভাষাকে রুক্ষ নয়, শ্রুতিমধুর করি। মুসলিম ভাইয়ের প্রতি হিংসা নয়, ভালোবাসি। বিভেদ ভূলে ঐক্য গড়ি।

০২ ফেব্রুয়ারি ২৪ টঙ্গীর আন-নুর জামে মসজিদে দেয়া জুমাপূর্ব আলোচনা থেকে অনুলিখন— মুহাম্মদ আব্দুল খালেক আশিক

নয়া শতাব্দী/আরজে

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ

x
Naya Shatabdi