ঢাকা, শুক্রবার, ২১ জুন ২০২৪, ৭ আষাঢ় ১৪৩১, ১৪ জিলহজ ১৪৪৫

খুশি আ’লীগ, বিএনপিতে মিশ্র

প্রকাশনার সময়: ১১ জুন ২০২৪, ০৮:২৩ | আপডেট: ১১ জুন ২০২৪, ০৮:২৮

ভারতের সংসদে এবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এনডিএ জোটগতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে এবং শপথের মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর হওয়ার মাইলফলক স্পর্শ করেন মোদি। আর এর মধ্য দিয়ে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর পর নরেন্দ্র মোদি তৃতীয়বার ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছেন।

মোদির শপথ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অংশ গ্রহণ এবং মোদির সঙ্গে আলাদা বৈঠকের গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে— এটা আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে মোদি সরকারে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেরই ইঙ্গিত। সেটা বাংলাদেশের নির্বাচনের আগেও দেখা গেছে। সামনেও দেখা যাবে। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বিএনপিতে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

গতকাল সোমবার সকালে নয়াদিল্লিতে এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যমান সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলেও জানান তিনি। দুই দেশে দুই প্রধানমন্ত্রীর (মোদি-হাসিনা) নেতৃত্বে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। শপথের পরপরই নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে, ভবিষ্যতের দিনগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক আরো গভীর হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমনটাই জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। সূত্র জানায়, বিএনপি নেতাদের মধ্যে ভারতের বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের পর দলটির একটি পক্ষ ভারতীয় পণ্য বয়কটের পক্ষে অবস্থান নেয়। ভারতের বিরুদ্ধে এমন অবস্থানের পর তীব্র সমালোচনায় মুখে পড়তে হয় এই নেতাদের। এরপর আস্তে আস্তে ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসছে দলটির নেতারা। তবে একটি পক্ষ মনে করছে ভারতের সাঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। তাই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কয়েক জন নেতাকে। তারা ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছেন।

ভারতের নতুন সরকার বাংলাদেশের জনগণের যে প্রত্যাশা, সেই প্রত্যাশাকে মর্যাদা দেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘ভারত আমাদের নিঃসন্দেহে প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশ। আমরা ভারতের নতুন সরকারের কাছে একটাই আশা করব, তাদের দেশে যেভাবে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে, এখনো তাদের নির্বাচন কমিশন যেভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, তাদের বিচার বিভাগ যেভাবে কাজ করতে পারে, আমরা ১৯৭১ সালে সেই লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম। আমরা দেশে গণতন্ত্রকে সেভাবেই প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। আমাদের প্রত্যাশা, সেভাবেই তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়বে।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, টানা দুইবার ক্ষমতায় থাকার পরও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। জনগণের বিভিন্ন ইস্যুতে নজর দিতে ব্যর্থ হয়েছে। হিন্দুত্ববাদীর কারণে মোদির জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছে। যার প্রভাব পড়েছে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে। শরিক নির্ভর সরকারে অনেক আশঙ্কাও রয়েছে, কারণ শরিকরা যদি কখনো অসন্তুষ্ট হয়ে বেরিয়ে যায় তাহলে সরকার টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে যাবে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ভারতীয় জনগণ বিজেপির একদলীয় শাসনকে প্রতিরোধ করেছে। একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে তারা অবস্থান নিয়েছে। ভারতীয় সংবিধান বহুত্ববাদী কাঠামো রক্ষা পেয়েছে। সাম্প্রদায়িক কাঠামো হোঁচট খেয়েছে। এতে করে স্বেচ্ছাচারিতার ভূমিকায় যাওয়া সহজ হবে না। তবে ভারতে কোয়ালিশন সরকারের ইতিহাস এর আগেও রয়েছে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে অতীতে যে কয়েকটি কোয়ালিশন সরকার গঠন হয়েছে মাঝপথে সেগুলো ভেঙে গিয়েছে, তার ইতিহাস রয়েছে। কারণ কোয়ালিশন সরকারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যাশা পূরণ না হলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। এমন পরিস্থিতিতে কোয়ালিশন সরকার নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে।

এবি পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বিজেপি এখনো ভারতের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় একক রাজনৈতিক দল, ২৪০ আসন পেয়েছে। সরকার গঠনে মাত্র ৩২ আসলের কমতি হয়েছে। নিকটবর্তী বড় দল কংগ্রেস মাত্র ৯৯টি আসন পেয়েছে। ভোটের শতাংশও খুব খারাপ করেছে তা বলা যাচ্ছে না, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন সাপেক্ষে মাত্র ১ শতাংশের মতো ভোট কম পেয়েছে। কোন কোন রাজ্যে বা আসনে ৫/৬ শতাংশ ভোটবিরোধী শিবিরে গেছে কিন্তু দিল্লিসহ অধিকাংশ শহুরে আসনে বিজেপি ভালো করেছে। দিল্লির সাতটা আসনে কিন্তু বিজেপি জিতেছে, অথচ দিল্লির প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতায় আম আদমি পার্টি। সব মিলিয়ে বিজেপির বাস্তবতা হচ্ছে যে তার হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিবাদ কায়েমের গতিতে একটু ভাটা পড়বে কিন্তু থেমে থাকবে না। মনে রাখতে হবে যে বিজেপির গোড়ার যে মৌলবাদী সংগঠন ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ’, আরএসএস’র শতবর্ষ পালিত হবে আগামী বছর। মোদির পরিকল্পনা ছিল যে কোনো মূল্যে যেন ৪০০ আসন পার হয়।

তাহলে সংবিধান সংশোধন করতে সুবিধা হবে যেটা বর্তমান বাস্তবতায় একটু কঠিন হতে পারে। মোদি-অমিত শাহ’র পরিকল্পনা ছিল এ দফায় উতরে গেলে ভারতীয় সংবিধান থেকে সেক্যুলারিজম বাদ দিয়ে অখন্দ ভারত/রাম রাজ্য প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেয়া হবে, সেটা হয়তো এবার সম্ভব হচ্ছে না। বিজেপি গ্রাম অঞ্চলে ভালো করতে পারেনি; এমনকি রামমন্দির তৈরী করা হয়েছে যে আসনে উত্তর প্রদেশের সেই ফায়েজাবাদ আসনেও বিজেপি হেরেছে, ৮০ শতাংশ হিন্দু ভোট হবার পরেও। তাই শরিক দল দুটোসহ উন্নয়ন আর অর্থনীতি কে ফোকাস করে কাজ করবে। তবে আমি আশ্চর্য হব না যে মোদি ছাড়া বিজেপি আবার পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতায় চলে আসলে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, ধনী-গরীবের ব্যাপক বৈষম্য, ভিন্নমত দমন, মুসলমানসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর দমন পীড়ন বিগত যে কোনো সময়ের রেকর্ড ছাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে বিজেপি, মোদি হোঁচট খেলেও তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি হারিয়ে যাওয়ার কোনো কারণ দেখছি না।

গত রোববার টানা তৃতীয় মেয়াদে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় ৭২ মন্ত্রীও শপথ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩০ জন মন্ত্রিসভার পূর্ণমন্ত্রী। অপর ৪১ প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে পাঁচজন দপ্তরবিহীন বা স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত। মন্ত্রীরা কে কোন দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা এদিন ঘোষণা করা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের দুজন বিজেপি সংসদ সদস্য (এমপি) প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন। আর সংসদের কোনো কক্ষে সদস্য না হয়েও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছেন বিজেপির দুই নেতা। দশ বছর পর জোট সরকার গঠন করতে বাধ্য হতে হলো বিজেপিকে, কারণ এবার নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি দলটি। মোদির প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদের সরকারে জোটের সহযোগী দলগুলো থেকে যথাক্রমে পাঁচ ও চার জন এমপি মন্ত্রিত্ব পেয়েছিলেন। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ জনে। অন্যদিকে এক দশক পর সংসদের নিম্নকক্ষ তথা লোকসভায় বিরোধী দল পাচ্ছে ভারত।

ভারতের লোকসভায় মোট আসন ৫৪৩টি। এনডিএ জোট পেয়েছে ২৯৩টি আসন, এর মধ্যে বিজেপি একাই জয় পেয়েছে ২৪০ আসনে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলীয় জোট ‘ইন্ডিয়া’ এবার ২৩৩ আসনে জয় পেয়েছে, কংগ্রেস একাই পেয়েছে ৯৯টি আসন। লোকসভায় এর আগের দুই মেয়াদে বিরোধীদলীয় নেতা ছিল না, কারণ দুবারই প্রয়োজনীয় ১০ শতাংশ আসনেও জয় নিশ্চিত করতে পারেনি কোনো বিরোধী দল। এবার রাহুল গান্ধীকে বিরোধী দল নেতা হিসেবে মনোনীত করেছে ‘ইন্ডিয়া’ জোট, তবে এখনো তা নিশ্চিত হয়নি। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন নরেন্দ্র মোদি। ২০১৯ সালের নির্বাচনেও তারই নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) সরকার গঠন করে। এবারের নির্বাচনে মোদির দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে বেশী আসনে জয় পায়।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ১৯৬৪ সালের ২৭ মে পর্যন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেস নেতা জওহরলাল নেহেরু। ১৯৫১-৫২ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ৪৮৯টি লোকসভা আসনের মধ্যে ৩৬৪টি আসনে জিতেছিল কংগ্রেস। দলটি ১৯৫৭ সালে ৪৮৯টি আসনের মধ্যে ৩৭১টিতে জিতেছিল। ১৯৬২ সালে তারা ৩৬১টি আসন জিতেছিল।

নয়াশতাব্দী/জিএস

নয়া শতাব্দী ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমার এলাকার সংবাদ